ব্লকলিষ্টের ভালোবাসা-আশিকুর রহমান সবুজ

প্রকাশিত: ২:৩৮ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২১ | আপডেট: ২:৫৩:পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২১
ব্লকলিষ্টের ভালোবাসা-আশিকুর রহমান সবুজ

লেখক-আশিকুর রহমান সবুজঃকেন জানি হঠাৎ করে আজ ফেইসবুকের ব্লকলিস্টে ঢুকার পর “নাসরিন আক্তার”নামক আইডিতে চোখ আটকে গেলো।আজ থেকে ছয় বছর আগে ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সালে নাসরিনকে ব্লক করেছিলাম। সেদিন ছিল নাসরিনের বিয়ে। আইডির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ঝাপসা হয়ে গেলো।জানি না, এক নজরে তাকিয়ে থাকার কারনে হয়তো চোখে জল জমার কারনে এমন ঝাপসা দেখাচ্ছে। হাত দিয়ে চোখটার পানি মুছলাম। তারপর নাসরিন আক্তার আইডিটি আনব্লক করলাম।প্রোফাইলে ঢুকলাম। । ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠাবো কিনা পাঠাবো না তা ভাবে পাচ্ছি না। প্রোফাইলে একটা ফুটফুটে ছোট বাচ্ছা মেয়ের ছবি দেওয়া।ছবি দেখা যাচ্ছে না।কারন প্রোফাইল লক করা।নাসরিন আক্তার নাম ও বাচ্চাটার ছবি আমাকে আরেক জগৎ এর মাঝে নিয়ে গেল।যেখানে মনের গহীন আমার সমস্ত কিছু
দখল করে নিয়েছে। চারপাশে কি হচ্ছে টের পাচ্ছি না। আমার সমস্ত কিছু কেমন জানি নেশার ঘুরের মত মনে হচ্ছে। একটা নামে এত শক্তি কি করে আসে। আমার হাতে যে মোবাইল আছে তাও ভালভাবে অনুভব করতে পারছি না।গভীর একটা আগ্রহ জাগছে তার প্রোফাইলে কি আছে তা দেখার জন্য। এই ছয় বছরে কি রকম পরির্বতন হয়েছে।
নাসরিন কে দেখতে বড্ড ইচ্ছে করছে।নাসরিনের সম্পূর্ন চেহারা মনে করতে পারতেছি না।আমার গভীর আগ্রহ আমার হাতকে দিয়ে সর্বশেষ ফ্রেন্ডরিকুয়েস্ট পাঠিয়ে দিল।। কিছু ভাল লাগছে না।নিজেকে বারে বারে প্রশ্ন করলাম, “কেন পাঠালাম? ” আবার রিকুয়েস্ট ক্যানসেলও করছি না বরং বারে বারে ফেসবুকে ঢুকে চেক করতে থাকলাম রিকুয়েস্ট কি এক্সেপ্ট করছে কিনা ।প্রায় আধঘন্টা পরে নোটিফিকেশন আসল।মনের ভিতর এক উত্তেজনার ঢেউ বয়ে গেল। আমি তার প্রোফাইলে ঢুকলাম। মেয়েটা ছবি অনেক সুন্দর দেখাচ্ছে। একই মেয়ের ছবি তার প্রোফাইলে অনেকগুলো। নিচে গিয়ে চোখে পড়ল একজন সুর্দশন ছেলের ছবি তার কোলেও মেয়েটি রয়েছে। ক্যাপশন দেওয়া আছে”আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ” ক্যাপশনটি দেখে বুকের ভিতর আবার ধাক্কা দিয়ে উঠল। কিছু কথা মনে পড়ে গেল। নাসিরনের সাথে যখন আমার সম্পর্ক ছিল তখন অনেকবার আমাকে এই কথা বলেছিলো। আচ্ছা এখন কি আমার সাথে নাসরিনের সম্পর্ক নাই। অনেকদিন কথা না বললে বা কারো বিয়ে হয়ে গেলে কি সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়? আমি এখনো নাসরিনকে অনুভব করতে পারি, অনুভব করতে পারি সে হাস্যউজ্জল চেহারা। সে মায়াঝড়ানো চোখ দুটো এখনো আমার বুকে ঝড় তুলে। নাসরিনের খাম খেয়ালি কথা গুলো
এখনো মনে আছে। নাসরিন এখন পর্যন্ত আমার দেখা সবচেয়ে ভাল একটা মেয়ে। এইরকম মেয়ের সাথে পরিচয় হওয়াও ভাগ্যের ব্যাপার।অতীতের কথাগুলো মনে খুব কষ্ট দিচ্ছে। নাসরিনের বিয়ের আগের একটা ঘটনা। সেদিন নাসিরনের সাথে কথা বলতে খুব ইচ্ছে করছিল কিন্তু আমার মোবাইলে ব্যালেন্স ছিল না বিধায় আমার বন্ধুর মোবাইল থেকে নাসরিনকে কল দিয়েছিলাম। সেদিন মোবাইলের একপাশে নাসরিনের মধুর কন্ঠ শোনার জন্য অধীর আগ্রহে বসেছিলাম।কিন্তু নাসরিন কল ধরছিল না।আমার এখনো মনে আছে মোট ৫০ বার কল দিয়েছিলাম।একটা কলও রিসিভ করে নাই। খুবই চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। আতিয়ার কিছু হয় নাই তো? কোন বিপদ বা অন্যকিছু? নাসিরন কি অসুস্থ? নাকি অন্য কোন বিপদ?কিছু বুঝতে পারছিলাম না। তখন ঐ মোবাইল থেকেই
একটা মেসেজ দিলাম।• “তোমার কি কিছু হয়েছে,নাসরিন।আমি সৌরভ “• মেসেজ দিয়ে আবার কল দিতে যাবো তখনই নাসরিনের মোবাইল থেকে কল আসল। কল ধরেই বললাম “তুমি কেমন আছো? ভাল আছো তো?কল ধরছো না কেন? আমার কথা বলা শেষ হওয়া মাত্র ঐ পাশ থেকে নাসরিন বলেছিল,”আমি ভাল আছি”
• -তো তুমি কল ধরোনি কেন?
• ~আমি এই নাম্বার চিনতাম না..
• -তো এখন কল ধরলে যে
• ~কারন এখন আমি জানি এটা তুমি
• -কেউ যদি এতবার কল দেয় তবুও ধরবে না?
কোন প্রয়োজনও তো থাকতে পারে।
• ~আমি অপরিচিত কোন কল রিসিভ করি না তোমার মেসেজ না পেলে এই কলও ধরতাম না।কথাগুলো সম্পূর্ন মনে আসছে না। কিন্তু এটা বুঝেছিলাম যে নাসরিন অপিরিচিত কারো সাথে সহজে কথা বলে না। নাসরিনের আরো অনেক কথা মনে পড়ছে।নাসরিনের সাথে আমি প্রথম দেখা করতে যায় বৈশাখের প্রথমদিকে। প্রতি এলাকায় বৈশাখী মেলা।মাঠে সোনালি পাকা ধান ধানের সৌনালি রঙের সাথে নাসরিনকেও উজ্জল দেখাচ্ছিল।মিষ্টি রঙের একটা শাড়িতে পুরো বাঙালি মেয়ের মত দেখাচ্ছিল। নাসরিনের সাথে ধানক্ষেতের
মাঝ দিয়ে মাটির আইল(রাস্তা) দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম মেলার দিকে। নাসরিন কথা বলেই চলছিল। আর আমি তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
হঠাৎ-ই নাসরিন থেমে যায়। আমিও সামনে তাকিয়ে থেমে যাই। সামনে তাকিয়ে দেখি আইল(রাস্তা) মাঝ বরাবর কাটা হয়েছে জমির যাওয়ার জন্য । আমি এক লাফে পার হয়ে গেলাম কিন্তু শাড়ি নিয়ে নাসিরন পার হতে পারেনি। আমি কি করবো বুঝতে পারি নি। কি যেন মনে করে নাসরিনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম। নাসরিন আমার হাত দেখে রাগী দৃষ্টিতে তাকালো। তখন ভয়ে আমার ভিতরে শূন্যতা সৃষ্টি হয়ে গেল। মুহূর্তের মাঝে পিপাসা অনুভব করতে লাগলাম।ওর দিকে হাত বাড়ানোটা মনে হয় উচিত হয় নি।নিজেকে তুচ্ছ মনে হচ্ছিলো। তাই হাত ফেরত আনতে লাগলাম, কি আশ্চর্য! আবার তখনই নাসরিনের চেহারা মুহূর্তে পরিবর্তন হয়ে গেল সেখানে ফুটে উঠল হাসির আভাস।বাতাসে সোনালি ধান যেমন দুলছিল তেমনি নাসিরনের হাসিও বাতাসের সাথে উঠানামা করছিল।অদ্ভুদ সুন্দর দেখাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল অন্য ভুবনের কোন রূপসী আমার সামনে দাড়িয়ে ছিল।আমি অপলক দৃষ্টিতে নাসরিনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম তখনই নাসরিন খপ করে আমার হাত ধরে ফেলল।তারপর নাসরিনের সাথে দিনরাত কথা হত। রাত পেরিয়ে কখন ভোরের আলো আলোকিত করত তা অনুভব করতে পারতাম। এখন সবই স্মৃতি হয়ে আছে।গত কতটা বছর আমাকে এই স্মৃতি কতবার কাঁদিয়েছে তা হিসাব ছাড়া।এসব কিছু নিয়ে যখন চিন্তায় মগ্ন তখনই নাসরিন আক্তার আইডি থেকে মেসেজ আসলো। ওপেরা মিনি ব্রাউজার দিয়ে ঢুকে দেখালাম মেসেজে লিখা আছে “তুমি ভালো আছো তো? খাওয়া দাওয়া করেছ? “তখন আমি কি করবো কিছু বুঝতে পারছি না।নাসরিনের উত্তর দেওয়া কি ঠিক হবে? কেনো ঠিক হবে না? আমি কি নাসরিনের সাথে খারাপ কিছু করতে চাচ্ছি? না, কখনই না। তা কখনই চাই নি । আর চাইবও না। আমি নাসরিনকে সম্মান করি। আর এই সম্মানটাই হলো নাসরিনের প্রতি আমার ভালবাসা।নাসরিনের সম্মান নষ্ট হবে এমন কাজ তো আমি করতে পারি না। আমার মন আমার সাথে আরো নানা রকম তর্ক করছে । তর্কে আমার মন জয়ী হলো। আমি খাওয়া দাওয়ার প্রতিত্তরে বললাম, “হুম” নেট প্রবলেমের
কারনে মেসেজ লোড হচ্ছে না। তাই কয়েকবার সেন্ড বাটনে চাপ দিলাম। এর কিছুক্ষন স্ক্রিনে তাকিয়ে আমার বিস্ময়ের সীমা থাকল না। নাসরিন দ্বিতীয় বার প্রশ্ন করেছিল,”আমার সাথে কি নতুন করে ঘর বাঁধতে পারবে?”আমি মোবাইলে স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি এই মেসেজের পরে আমার “হুম ” মেসেজ তিনবার সেন্ড হয়ে গেছে।সবকিছু নেটের সমস্যার কারনে হয়েছে। এই ব্রাউজার দিয়ে ফেসবুকে এমন সাধারনত হয়ে থাকে। এখন
আমি কি করবো? আমি কি নাসরিনকে বলব এটা ভুলে গেছে, নাকি যেমন আছে তেমনই থাকবে। তখনই আবার তর্কে ঢুকে গেলাম।নাসরিনের একটা সংসার আছে, স্বামী আছে,আরেকটা পরিবার আছে।সেখানে নাসরিনের নিজস্ব সম্মান আছে। এসব কথা চিন্তা করে আমি সিন্ধান্ত নিলাম নাসরিনকে আমার মেসেজের ভুলের কথা বলব। তখন মেসেজ টাইপ করতে গিয়ে স্ক্রিনে নাসরিনের আরেকটি মেসেজ দেখে চোখ মোবাইল স্ক্রিনে আটকে গেল। আমার পায়ের তলা থেকে যেন মাঠি সরে যাচ্ছে।বুকের ভিতর হৃদপিন্ডের ধক্ ধক্ শব্দ শোনতে পাচ্ছি।হাতের আঙ্গুল গুলো শক্ত লোহার মত হয়ে গেছে। কোন শক্তি পাচ্ছি না তখনই হঠাৎই
আমার হাত থেকে মোবাইলটা পড়ে গেল।নাসরিন ম্যাসেজে ছিলো…আমার স্বামী মাদকাসক্ত আর পরকিয়াই লিপ্ত আমাকে ডিভোর্স দিয়েছে ৬ মাস হয়,আমার ১বছরের বাচ্ছাটাও কঠিন এক অসুস্থতার কাছে হেরে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে,আমি এখন কি নিয়ে বাচবো?নাসরিনের এমন কথায় আকাশ ভেঙ্গে আমার মাথায় পড়ার মতো।

 

Print

পুরাতন খবর দেখুন..

Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930