ইশতেহারে নয় মন্ত্রীসভার শেষ বৈঠকেই চাকরির বয়স ৩৫ করা হোক

মানিক মিয়া মানিক মিয়া

সদর প্রতিনিধি, গাজীপুর

প্রকাশিত: ১১:১১ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ২, ২০১৮ | আপডেট: ১১:১১:পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ২, ২০১৮
ইশতেহারে নয় মন্ত্রীসভার শেষ বৈঠকেই চাকরির বয়স ৩৫ করা হোক

সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা ৩০ বছর থেকে বাড়িয়ে ন্যূনতম ৩৫ বছর করণের দাবিতে লাখ লাখ উচ্চ শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা বিগত ৭ বছর থেকে চলতি বছরে দফায় দফায় আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি জানিয়ে আসছে। অথচ বর্তমান সরকারের শীর্ষ মহলের বেশ কয়েকজন এই সময়ে বারবার আন্দোলনকারী তরুণ-তরুণীদের আশ্বস্থ করেছেন তাদের দাবি দ্রুতই মেনে নিয়ে বাস্তবায়ন করে দেয়া হবে। এই দাবির যৌক্তিকতায় তাদের সাথে বেশ কয়েকবার (অনধিক ৩ বার) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এর পক্ষে সুপারিশ করেছে। ক্ষমতাসীন সরকারের টানা দুই আমলে জাতীয় সংসদে অসংখ্যবার এর পক্ষে প্রস্তাব রেখেছেন অসংখ্য এমপি-মন্ত্রীরা। বারবার তারা দেখা স্বাক্ষাত করে স্মারকলিপি প্রদান করেছেন প্রভাবশালী মন্ত্রী ও সাংসদদের। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাননীয় রাষ্ট্রপতি জনাব আব্দুল হামিদ, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী জনাব ওবায়দুল কাদের, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন সহ আরও বেশ কয়েকজন। তাঁরা সবসময় বলেছেন দাবির বাস্তবায়ন এই মাসে হবে, ওই মাসে হবে। বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ মমতাময়ী মায়ের ভূমিকায় বারবার সরকার প্রধানের কাছে পয়েন্ট অব অর্ডারে সহ বহুবার সুপারিশ করেছেন। কিন্তু কোন এক অজানা কারণে বারবার সরকার প্রধান রয়েছেন নিরব ভূমিকায়। বিগত ৭ বছরের আন্দোলনের চিত্র তুলে ধরলে নিঃসন্দেহে বলতে হবে ৭১ পরবর্তী বাংলাদেশে ছাত্র দাবি কেন্দ্রিক এটাই সবচেয়ে সুদীর্ঘ ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। এই সময়ে ছাত্রছাত্রীরা যতবার মাঠে নেমে আন্দোলন করেছেন তার বেশিরভাগ সময়েই তারা পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অনেককে করতে হয়েছে কারাবরণ। যে সব ছাত্রছাত্রীরা মাঠে আসে তাদের সকলেই পরিণত বয়সের এবং উচ্চ শিক্ষিত। চাকরির বয়স বাড়াতে মাঠে এসে যে পরিমাণ হেনস্তার শিকার হন তাতে তারা একরকম লজ্জাবোধ থেকেই পরবর্তীতে আর মাঠে আসতে চান না। কিন্তু এর আড়ালে তারা কতটা হতাশা আর মানসিক যন্ত্রণায় দিনাতিপাত করছেন তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। আন্দোলনের শুরু থেকে এই পর্যন্ত অনেকেরই বয়স হয়ে গেছে প্রায় ৩৫ ছুঁইছুঁই। চাকরির বয়স বাড়িয়ে দিলে দেশের বা সরকারের কি এমন ক্ষতি হয়ে যাবে? বরং-দেশে বেকারত্ব কমবে, হতাশায় কেউ আর আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে না, মাদক সেবন, ব্যবসা ও নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সাথে যুক্ত হওয়ার মত অপরাধে তারা জড়িত হবে না, বেসরকারি ক্ষেত্রেও প্রবেশের সুযোগ পাবে আর পাশাপাশি সরকার আবেদনে পরীক্ষার ফি হিসেবে ব্যাংক ড্রাফ্‌ট বা ট্রেজারি চালান মারফত কোটি কোটি টাকা পাবে। তাই অন্তত তাদেরকে সুযোগটুকু দেয়া যেতে পারে। সরকারের যদি তরুণদের প্রতি ভালবাসা থাকতো, তাদেরকে নিয়ে সমৃদ্ধ দেশ গড়ার চিন্তা থাকতো তাহলে উন্নয়নমুখী চিন্তা থেকেই দ্রুত এর বাস্তবায়ন করে দিত। কিন্তু আমাদের দেশের সরকাররা শুধু তরুণদের দুর্বলতা, বেঁচে থাকার স্বপ্ন আর আবেগকে নিয়েই চিনিমিনি খেলে। তাদেরকে প্রতিবার নির্বাচনের আগে চমকপ্রদ সব পরিকল্পনা ইশতেহারে যুক্ত করেছে দেখানো হয়। আর এভাবেই এসবকে পুঁজি করেই তারা নির্বাচনে জয়লাভ করে আসছে। অথচ নির্বাচনে জয়লাভের পরই ক্ষমতাসীনরা এই সব চমকপ্রদ সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা ভুলে যান। ভুলে গেলে চলবে না এদেশের ছাত্রসমাজের অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অবদানের কথা। ৫২, ৫৬, ৫৮, ৬২, ৬৮, ৬৯, ৭০ এবং ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তরুণরাই বারবার প্রাণ দিয়েছে, উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। তাই এক রকম মায়া-মমতা ও কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে তাদের চাওয়া-পাওয়াকে সবসময় যে কোন ক্ষমতাসীন সরকারের গুরুত্ব দেয়া উচিৎ।
২০১৫ সালে জাতিসংঘ যে এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছিল তার ১৭ টি অভীষ্টের মধ্যে অন্তত ১০ টির সঙ্গে যুবশক্তি সরাসরি জড়িত। অথচ ৩ বছর পার হলেও যুবক বা তরুণদের ভাগ্যন্নয়নে বাংলাদেশ বড় ধরণের সাফল্য অর্জন করেছে এ কথা বলা যাবে না। এখনও আমাদের যুবকদের একাংশ দারিদ্রের নিগড়ে বন্দি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা সহ বিভিন্ন রকম মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত। আবার নানা বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে যেসব তরুণ উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন, তারাও চাকরি পাচ্ছেন না। তাছাড়া এই বিশাল শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে অবহেলা ও অনাদরে উন্নয়নের ধারার বাইরে রেখে দেশে কখনই টেকসই উন্নয়ন হতে পারে না। অথচ তাদের পিছনে রাষ্ট্র ও পরিবার বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা দাবি করেন, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এক কোটিরও বেশী যুবকের চাকরির পরিকল্পনা আছে। কিন্তু এই পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে যে বিরাট দূরত্ব রয়েছে সেটিই যুবকদের দুঃসহ বেকারত্ব চোখে আঙ্গুল দেখিয়ে দেয়। বিগত এক দশকেরও বেশী সময়ে সেশন জট, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, স্বল্প নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি থাকায় তারা অকারণে জীবন থেকে প্রয়োজনীয় সময় হারিয়েছেন আর ফলস্বরুপ চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ কম পেয়েছেন। নিয়মতান্ত্রিকভাবে এসব দায়ভার সরকারের উপরই বর্তায়। তাই এই সব তরুণ-তরুণীদের কথাও ভাবতে হবে। দিতে হবে তাদেরকেও পর্যাপ্ত সুযোগ। অন্তত সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে হলেও দাবিটির বাস্তবায়ন করে দিয়ে পূর্ব প্রতিশ্রুতি রক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে এ সংক্রান্ত দায়ভার থেকে সরকারের নিজেকে মুক্ত করা উচিৎ। অন্যদিকে সম্প্রতি আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের সংগঠন ‘’বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র পরিষদের’’ সাধারণ সম্পাদক এম এ আলী ইতোমধ্যে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে লাখো বেকারের প্রতিনিধি হয়ে তাদের পক্ষে নির্বাচনের আগেই সরকারকে এর প্রজ্ঞাপন জারির দাবি জানিয়েছেন।
বিগত বছরগুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম। চলতি বছরে বেশ কয়েকবার রাজধানী ঢাকার শাবাগে ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন রকম কর্মসূচী পালন করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, কোন দাবি আদায় করতে হলে মাঠে নেমে আন্দোলন করতে হবে। দেখাতে হবে এর পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন। আর তাই অক্টোবরেও বেশ কয়েকবার শাহবাগে হাজারো তরুণ-তরুণী এই দাবিতে মাঠে নেমেছেন। শাহবাগের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা অবরোধ করেছেন। পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও ফলাও করে এই খবর প্রচার করেছে। যা দেশের সকল শ্রেণীর মানুষের চিন্তা-চেতনায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আর তাই বর্তমানে বিষয়টি একটি জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।। এত কিছুর পরে সরকার নিশ্চুপ। আসন্ন নির্বাচনে দেশের মোট ভোটার সংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখ ৪২ হাজার ৩৮১ জন। যার মধ্যে অনূর্ধ্ব ৩৫ বছর বয়সী ভোটার সংখ্যা ২ কোটি ৩০ লাখের মত। এরা সবাই ক্ষমতাসীন সরকারের কাছে কিছু চান। আর এ কথা অস্বীকার করাও যাবে না এই তরুণরা এবং এদের পরিবারের সদস্যরাই বর্তমান সরকারকে বিগত দুই আমলে ক্ষমতায় আসতে ভোট প্রদানের মাধ্যমে সহায়তা করেছে। অথচ একাদশ জাতীয় নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ভোটব্যাংক রয়েছে এবারও তরুণদেরই দখলে। তবে এবার তারা আর ইশতেহারে যুক্ত করা চমকপ্রদ প্রতিশ্রুতি চায় না। তারা এখনও স্বপ্ন দেখছে। তীর্থের কাকের মত তাকিয়ে আছে ক্ষমতাসীন সরকার প্রধানের দিকে। তারা চায় আসন্ন নির্বাচনের আগেই মন্ত্রীসভার শেষ বৈঠকে তাদের দাবির বাস্তবায়ন করা হোক। আর সরকারও চাইলেই পারে ছোট্ট এই দাবিটি মেনে নিয়ে দ্রুতই বাস্তবায়ন করে দিয়ে ভোটের পাল্লা ভারী করতে।


পুরাতন খবর দেখুন..

Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031